তুরস্কের ভূমিকম্প বিধ্বস্ত কোনো কোনো স্থানে উদ্ধারকর্মী পৌঁছাতে ১২ থেকে ১৭ ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। তুষার ও বৃষ্টির কারণে ঢিমেতালে চলছে উদ্ধারকাজ। ত্রাণ ও সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবস্থাপনার বিশৃঙ্খল অবস্থা। হাসপাতালগুলোয় তিল ধারণের স্থান নেই। এ অবস্থায় এরদোয়ান সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে।
তুরস্কের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল গাজিয়ানতেপ শহরে বাস করেন ইব্রু ফিরাত। মঙ্গলবার (৭ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় সময় রাত ৯টা পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছে ফিরাতের এক চাচাত বোন।
ফিরাত বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমার চোখের জল শুকিয়ে গেছে। ভূমিকম্পের ১২ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর এখানে উদ্ধারকর্মীরা আসেন। কিন্তু মানুষ জীবিত আটকা পড়ে আছেন এমন কোনো কোনো স্থানে পৌঁছাতে তাদের ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা লেগে গেছে।’
একই অঞ্চলের ৬১ বছর বয়সি সেলাল ডেনিজেরও প্রায় একই অভিযোগ। ডেনিজ বলেন, ‘মঙ্গলবার সকাল থেকে এখানে মানুষ বিদ্রোহ করতে শুরু করেছে। কারণ, পর্যাপ্ত উদ্ধারকর্মী নেই, ত্রাণ নেই, স্বাস্থ্যসেবা নেই। নেই আর নেই। কিন্তু কেন?’
তবে উদ্ধারকাজের গাফিলতি আছে, এমন অভিযোগ মানতে নারাজ তুরস্কের রেড ক্রিসেন্ট প্রধান কেরেম কিনিক। মঙ্গলবার দেশটির একটি বেসরকারি টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিনিক বলেন, ‘তুরস্কে এমন কোনো স্থান নেই যেখানে আমাদের উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছাতে পারে না। আমরা সব ধরনের তৎপরতা চালাতে সক্ষম। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে।’
‘ভূমিকম্প কর’ নিয়ে প্রশ্ন
১৯৯৯ সালে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পে রীতিমতো গোরস্তানে পরিণত হয়েছিল তুরস্কের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল। সেই ভূমিকম্পে নিহত হয়েছিল ১৭ হাজারের বেশি। উদ্বাস্তু হয়েছিল আড়াই লাখের বেশি মানুষ। এরপর দেশটিতে চালু করা হয় ‘ভূমিকম্প কর’।
ভূমিকম্প করের দিকে ইঙ্গিত করে সেলাল ডেনিজ বলেন, ‘এত বছর পরও ভূমিকম্প দুর্গত মানুষকে না খেয়ে থাকতে হবে কেন? তাদের রাস্তায় থাকতে হবে কেন? তাদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই কেন? ১৯৯৯ সাল থেকে আমরা যে কর দিয়ে আসছি, তা কোথায় গেল?’
ভাতিজা হারানোর শোকে মুহ্যমান ডেনিজ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘কেরেম কিনিক বাস্তব পরিস্থিতি না জেনে কথা বলছেন। তিনি মানুষের সঙ্গে মশকরা করছেন।’
সরকারি তথ্যমতে, ইতোমধ্যে প্রায় ৪৬০ ডলার ভূমিকম্প কর সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব অর্থ জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ত্রাণকাজে ব্যয় করার কথা। কিন্তু তহবিলপিট কোন খাতে ব্যয় করা হয়, কীভাবে তা করা হয়, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো কিছু প্রকাশ করা হয়নি।
বিরোধীদের হুঁশিয়ারি
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গাফিলতির অভিযোগে তুরস্কের বিরোধী দলগুলো ইতোমধ্যে এরদোয়ান সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। যেসব বিরোধী দল ভূমিকম্প বিধ্বস্ত এলাকায় ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে, তাদের মধ্যে ডানপন্থি আইই পার্টি অন্যতম।
আইই পার্টির এক নেতা এএফপিকে বলেন, ‘ভূমিকম্প বিধ্বস্ত যেকোনো স্থানে যান, দেখবেন কোনো পরিকল্পনা নেই। মানুষ রাস্তায় ঘুমাচ্ছে। না খেয়ে থাকছে। গ্যাস নেই, পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই। মানুষের দুর্ভোগের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। জনগণ এসব মনে রাখবে।’
তুরস্কের প্রধান বিরোধীদলীয় জোট দ্য ন্যাশন অ্যালায়েন্স বা দ্য টেবল অব সিক্সের এক নেতা বলেন, ‘১৯৯৯ সালের পর দুই যুগের বেশি সময় আমরা হাতে পেয়েছি। বলতে গেলে এর পুরোটা সময় ক্ষমতায় আছেন এরদোয়ান। তিনি জনগণকে এখন কী বলবেন? মে মাসে জনগণ ব্যালটে এর জবাব দেবে।’
জরুরি অবস্থা জারি
২০০৩ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে দেশটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একেপি) এ নেতা ভূমিকম্প উত্তর পরিস্থিতি মোকাবিলায় মঙ্গলবার (৭ ফেব্রুয়ারি) থেকে ১০ প্রদেশে ৩ মাসের জরুরি অবস্থা জারি করেছেন।
জরুরি অবস্থা চলাকালে পার্লামেন্টকে এড়িয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করেন তিনি। এতে চলাফেরায় কড়াকড়ি ও নানা ধরনের নাগরিক অধিকার সীমিত করতে পারবেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও তার মন্ত্রিসভা। ঠিক তিন মাস পরই দেশটিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। ভাষণে এরদোয়ান বলেন, ‘পুরো জাতি কল্পানাতীত দুর্যোগে আটকে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। ভূমিকম্প বিধ্বস্ত অঞ্চলের দিকেই সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে হবে। তাই তিন মাসের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলো।’
ইস্তাম্বুলভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাশার আস-সায়েফ এএফপিকে বলেন, ‘চলতি বছরের মে মাসে আমাদের জাতীয় নির্বাচন। এ নির্বাচনে নিজের ক্ষমতা তিন দশকে বিস্তৃত করতে চাইবেন এরদোয়ান। কিন্তু এখন পুরো বিষয়টি এই ভূমিকম্প কীভাবে সামাল দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করছে।’
নিহত ১১ হাজার ছাড়াল
স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে তুরস্কে ও সিরিয়ায় নিহতের সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে। নিহতদের মধ্যে ৮ হাজার ৫৭৪ জন তুরস্কে, আর সিরিয়ায় আড়াই হাজারের বেশি। উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্থানীয় সময় বুধবার (৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুর আড়াইটার দিকে সর্বশেষ হালনাগাদে এসব তথ্য জানিয়েছে।
সোমবার (৬ ফেব্রুয়ারি) শেষ রাতে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প তুরস্ক ও সীমান্তবর্তী সিরিয়ায় আঘাত হানে। প্রায় ১১ মাইল গভীর তুরস্কের গাজিয়ানতেপ প্রদেশে ভূমিকম্পটির উৎপত্তি। ছোট ছোট প্রায় ৭৮টি ভূমিকম্পের পর সোমবার বিকালে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে একই স্থানে। সোমবারের ভূমিকম্পে শুধু তুরস্কে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের পর তুরস্কে এটিই ভয়াবহতম ভূমিকম্প।
সূত্র : রয়টার্স, এএফপি, আল জাজিরা।