বর্ণিল আয়োজনে উদযাপিত হচ্ছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

বর্ণিল আয়োজনে উদযাপিত হচ্ছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মহান মুক্তিসংগ্রামের ৫০ বছর। তাক লাগানো এমন আয়োজনে বিশ্ব সমক্ষে পরস্ফুিট হবে নতুন এক বাংলাদেশ। দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার দিন ১৬ ডিসেম্বর আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশের পাশাপাশি ইতিহাস চর্চা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে নব জাগরণের সৃষ্টির লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়েছে বিশেষ কিছু কার্যক্রম। এবারই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে অংশ নিচ্ছে যুদ্ধে সহায়তাকারী ও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি দানকারী চার মিত্র দেশ।

স্বাধীনতার ৫০ বছরকে স্মরণীয় করে রাখতে ৫০টি জাতীয় পতাকাসহ বর্ণিল শোভাযাত্রা প্রদক্ষিণ করবে দেশের ৬৪ জেলা। কুচকাওয়াজে সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত বাহিনীর অংশগ্রহণ, বিমান বাহিনীর বিশেষ ফ্লাই-পাস্ট ও অ্যারোবেটিক এয়ার শো এনে দেবে ভিন্ন আমেজ। এ ছাড়া ‘পথে পথে বিজয়’ শিরোনামে দেশের ২১টি স্থানে আঞ্চলিক মহাসমাবেশ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা প্রদান বিজয়ের অনুষ্ঠানকে নিয়ে গেছে অনন্য মাত্রায়।
এদিকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে যুদ্ধজয়ী জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত শুভেচ্ছা বাণী পাঠানো হবে। আয়োজন করা হবে গণহত্যাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনার। জাতীয় সংসদ, হাতিরঝিল ও অন্যান্য স্থানে নির্ধারিত দিনে থাকবে ‘লাইট অ্যান্ড লেজার শো।’ সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠেয় মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অংশ নেবেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোভিন্দ ও ভুটানের সাবেক (চতুর্থ) রাজা জিগমে সিঙ্গে ওয়াংচুক।
বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির আহ্বায়ক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক জানান, ‘১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বছর ২০২১ সাল। সুবর্ণজয়ন্তীর বছরটিকে আমরা ইতিহাস চেতনা জাগ্রত করার কাজে লাগাতে চাইছি। উদযাপনের পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কথা স্মরণ করতে চাইছি। এই কারণে অনুষ্ঠানে আনা হয়েছে বৈচিত্র্য।’ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠান সবার মনে অম্লান হয়ে থাকবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিজয়ের আনন্দ যাতে দুষ্কৃতকারীরা কোনোভাবেই ম্লান করে দিতে না পারে সে লক্ষ্যে জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টিও বিশেষভাবে ভাবা হচ্ছে। ভেন্যুর এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো গ্যাসচালিত গাড়ি রাখা যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, জাতীয় প্যারেড স্কয়ার, সংসদ ভবন ও টুঙ্গিপাড়ায় এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো গ্যাস সিলিন্ডারের গাড়ি রাখা যাবে না। এক কিলোমিটার দূরে গাড়ি রেখে সভাস্থলে আসতে হবে। অনুষ্ঠান ঘিরে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি উপ-কমিটি এবং দেশি-বিদেশি অতিথিদের নিরাপত্তার জন্য আরেকটি উপ-কমিটি করে দেয়া হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী ১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর সংসদ ভবনের অনুষ্ঠানস্থল ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে।

আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার ৫০ বছরে ৫০টি জাতীয় কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এসব কর্মসূচির আওতায় ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে মহাসমাবেশ আয়োজন করা হবে। ৫০টি জাতীয় পতাকাসহ সুবর্ণজয়ন্তীর বর্ণিল শোভাযাত্রা দেশের ৬৪ জেলা প্রদক্ষিণ করবে। যুদ্ধজয়ী জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত শুভেচ্ছা বাণী পাঠানো হবে। গণহত্যাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন করা হবে। জাতীয় সংসদ, হাতিরঝিল ও অন্যান্য স্থানে নির্ধারিত দিনে থাকবে ‘লাইট এ্যান্ড লেজার শো।’

জানা যায়, ১৬ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে বিশেষ কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হবে। সম্মিলিত বাহিনীর বর্ণিল কুচকাওয়াজে সশরীরে উপস্থিত থাকবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। চলন্ত যান্ত্রিক সামরিক কন্টিনজেন্টের সালাম গ্রহণ ও কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করবেন তিনি। কুচকাওয়াজে অংশ নেবেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিএনসিসি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, র্যাব, আনসার ও ভিডিপি এবং কারারক্ষীদের আলাদা আলাদা দল। থাকবে বিমানবাহিনীর বিশেষ ফ্লাই-পাস্ট ও আকর্ষণীয় অ্যারোবেটিক এয়ার শো। সমান আকর্ষণীয় হবে আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় হেলিকপ্টার থেকে রজ্জু বেয়ে অবতরণ ও প্যারাস্যুট জাম্প।

সূত্র জানায়, এবারের বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে অংশ নিতে ঢাকায় আসছে রাশিয়া, ভারত, ভুটান ও মেক্সিকোর প্রতিনিধি দল। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সর্বোচ্চ সহায়তাকারী দেশ হিসেবে ভারত, রাশিয়া এবং বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতিদানকারী দেশ হিসেবে ভুটান এবং মেক্সিকোকে এ ঐতিহাসিক কুচকাওয়াজে অংশ নেয়ার জন্য বাংলাদেশের পক্ষে আমন্ত্রণ জানিয়েছে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ। বাংলাদেশের নৌ-প্রধানের ভারত সফরের সময়েই স্থির হয়েছিল, ঢাকায় এবারের বিজয় দিবসের উদ্যাপনে যোগ দিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি প্রতিনিধি দল ও সামরিক ব্যান্ড বাংলাদেশে আসবে। বিজয় দিবসের কর্মসূচিতে ভারত ও রাশিয়ার ওয়ার ভেটেরানদের (যুদ্ধজয়ী প্রবীণ যোদ্ধা) সস্ত্রীক বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলেও জানা গেছে।

এদিকে ১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী দুজনই যোগ দেবেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোভিন্দ। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে ভারতের কোনো রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান অংশ নেননি। এটি এবারই প্রথমবারের মতো ঘটছে। এ ছাড়া আমন্ত্রিত হয়ে আসছেন ভুটানের সাবেক (চতুর্থ) রাজা জিগমে সিঙ্গে ওয়াংচুকও।

এদিকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে এরই মধ্যে আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক পর্যায়ে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান প্রদর্শন শুরু করেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ২৬ নভেম্বর দিনাজপুরে উপ-আঞ্চলিক মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে এ কর্মসূচির সূচনা করা হয়। সারাদেশে ২১টি মহাসমাবেশ আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চগড়ে আঞ্চলিক মহাসমাবেশ হয়েছে ২ ডিসেম্বর, যশোরে ৬ ডিসেম্বর, গোপালগঞ্জে ৭ ডিসেম্বর, কুমিল্লায় ৮ ডিসেম্বর, জামালপুরে ১১ ডিসেম্বর, কক্সবাজারে ১২ ডিসেম্বর। সিলেটে ১৫ ডিসেম্বর মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ফরিদপুরে উপ-আঞ্চলিক মহাসমাবেশ হয়েছে ১ ডিসেম্বর। মাদারীপুরে ৩ ডিসেম্বর, বাহ্মণবাড়িয়ায় ৪ ডিসেম্বর, ফেনীতে ৬ ডিসেম্বর, ময়মনসিংহে ৬ ডিসেম্বর, শেরপুরে ৮ ডিসেম্বর, মিরসরাইয়ে ৯ ডিসেম্বর, পটিয়ায় ১১ ডিসেম্বর, মৌলভীবাজারে ১১ ডিসেম্বর এবং সুনামগঞ্জে গতকাল ১৩ ডিসেম্বর উপ-আঞ্চলিক মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মহান স্বাধীনতার ৫০ বছর উপলক্ষে এবার জাতীয় সংসদে সাধারণ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদ নেতা শেখ হাসিনার ১৪৭ বিধিতে উত্থাপিত প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়। এর আগে প্রস্তাবটির ওপরে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি, বিরোধীদল ও বিএনপির সংসদ সদস্যরা দু’দিনব্যাপী বিশেষ আলোচনায় অংশ নেন। এতে ৫৯ জন সংসদ সদস্য ১০ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে স্পিকার প্রস্তাবটি সংসদে ভোটে দিলে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *