জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারও মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘ প্রায় ১ দশক পর গত ১০ জুন ঢাকায় সমাবেশ করে দলটি। নির্বিগ্নে ওই সমাবেশের পর পুলিশকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় দলটির নেতা-কর্মীরা। এরপর চলতি মাসে সিলেটে জামায়াত সমাবেশ করতে চাইলে সেখানে অনুমতি দেয়নি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
গত ২৪ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠা, জামায়াত নেতা ডাঃ শফিকুর রহমানসহ গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মী ও ওলামায়ে কেরামের মুক্তি এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণের দাবিতে জামায়াতে আগামী ২৮ জুলাই বিভাগী শহরগুলোতে বিক্ষোভ মিছিল, ৩০ জুলাই জেলা শহরগুলোতে বিক্ষোভ মিছিল এবং ১ আগস্ট ঢাকায় বিক্ষোভ সমাবেশের ঘোষণা দেয়।
ওই সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত নেতারা বলেন, ‘সরকার ২০১৪ ও ২০১৮ সালের স্টাইলে আবারও নির্বাচন করতে চাইছে। এ লক্ষ্যে সরকার প্রশাসনকে ঢেলে সাজাচ্ছে। আরপিও সংশোধনের নামে কার্যত নির্বাচন কমিশনকে আরও আজ্ঞাবহ করেছে। সিলেট ও চট্টগ্রামে সমাবেশের অনুমতি না দিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণগ্রেফতার করা হচ্ছে। সরকার গত ১৫ বছরে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তাদের অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণ মূলক হয়নি। তাদের অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হতে পারে না। সরকারের মন্ত্রী ও এমপিরা সংবিধানের দোহাই দিয়ে নিজেদের অধীনে একটি প্রহসনের নির্বাচন করতে চাইছে। জনগণ সরকারের এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন হতে দিবে না।’
সেই ঘোষণার আলোকে এবার দলটির লিগ্যাল টিমের সদস্যরা মঙ্গলবার (২৫ জুলাই) দুপুরে ডিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে গিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশের অনুমতির জন্য আবেদন করেন। এর আগে দলটির লিগ্যাল টিমের সদস্যরা রাজশাহী, ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম এবং কুমিল্লাসহ বিভিন্ন মহানগরীতে বিক্ষোভ মিছিলের জন্য পুলিশ প্রশাসনের কাছে লিখিতে আবেদন করে জামায়াত।
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে দলটির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির রায় কার্যকরের পর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলটির নেতাকর্মীরা রাজপথে নজিরবিহীন বিক্ষোভ করে। এরপর সরকারের টানা ধরপাকড়ের মধ্যে থাকা দলটির প্রকাশ্যে প্রায় ১ দশক কোনো সমাবেশ করতে পারেনি। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর গত ১০ জুন হঠাৎ পুলিশের অনুমতি নিয়ে রাজধানীতে শোডাউন করে জামায়াত। এতে বড় দুটি দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এরপর জামায়াত সিলেট ও চট্টগ্রামে সমাবেশ করতে চাইলেও পুলিশ সেখানে তাদের সমাবেশের অনুমতি দেয়নি।
ঢাকায় বিক্ষোভ সমাবেশের অনুমতির বিষয়ে সাংবাদিকদের জামায়াতের লিগ্যাল টিমের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এড. সাইফুর রহমান বলেন, ‘ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার সৈয়দ মামুন মোস্তফা আমাদের চিঠি গ্রহণ করেছেন। আগামী ১ আগস্ট মঙ্গলবার বেলা ২টায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে আমরা সমাবেশের অনুমতি চেয়েছি। অনুমতি পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে দ্রুতই সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে জানান সাইফুর রহমান।
জেলা ও মহানগরীগুলোতে জামায়াতের হঠাৎ এমন কর্মসূচীতে বিব্রত আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা। একদিকে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির একের পর এক কর্মসূচি অন্যদিকে জামায়াতসহ সমমনা দলগুলোর প্রতিদিন কোনো না কোনো কর্মসূচির কারণে দীর্ঘ সময় ডিউটিতে থাকতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। অনেকে পর্যাপ্ত বিশ্রমও নিতে পারছেন না।
এদিকে সরকারের পদত্যাগে একদফা দাবি আদায়ে চূড়ান্ত আন্দোলনের শেষ ধাপে রয়েছে বিএনপি। আগামী ২৭ জুলাই ঢাকায় নেতাকর্মীদের ঢল নামাতে চান তারা। এ কর্মসূচিকে টার্নিং পয়েন্ট হিসাবে দেখছেন দলটির হাইকমান্ড। একইদিন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং ছাত্রলীগ শান্তি সমাবেশের ডাক দিয়েছে। দেশের এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পুলিশে চলছে পদোন্নতি আর বদলি।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের দাবি, এসব বদলির সঙ্গে নির্বাচন বা রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। পুলিশের পদোন্নতি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া।
সচিবালয়ে নিজ দফতরে আগামী ২৭ জুলাই কর্মসূচি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসা গেল কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের সিদ্ধান্ত কী হবে? দেখুন, হঠাৎ করেই তারা (বিএনপি) এমন-এমন কর্মসূচি দিচ্ছে যেগুলোয় জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। যদি জনগণ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আসে তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই কিন্তু জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে, রাস্তাঘাট বন্ধ করে তারা যদি কিছু করে আমরা তখনই বাধা দেব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুজন নেতা বলেন, রাজপথে নৈরাজ্য করলে অতীতের মতো বিএনপি-জামায়াত কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। মানুষের জানমালের ক্ষতি করবে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করবে, জ্বালাও পোড়াও করবে এমন হলে কাউকে ছাড়ে দিবে না আওয়ামী লীগ।
মার্কিন ভিসানীতি ঘোষণার পর রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোতে পুলিশের আগের মত মারমুখি আচরণ ও গণগ্রেফতার দৃশ্যত কমেছে। যার ফলে বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে। এমতাবস্থায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ২৮ ও ৩০ জুলাই জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল। এরপর ১ আগস্ট ঢাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ। এমন কর্মসূচিতে জামায়াতের কৌশল কি? প্রশাসন তাদের সমাবেশের অনুমতি দিবে তো? তা-ই দেখার অপেক্ষা করতে হবে আগামী তিন চারদিন।