পায়ে হেঁটে হজ করতে যাওয়া সেই শিহাবের সফর বৃত্তান্ত

ভারতের কেরালা প্রদেশের বাসিন্দা শিহাবুদ্দিন সাইয়েদ আলাঈ। আপনজনদের মাঝে শিহাব ছোটু নামে পরিচিত তিনি। মায়ের কোল থেকেই তিনি পায়ে হেঁটে হজ করা হাজিদের নানা গল্প শুনে তিনি বড় হয়েছেন। জীবনের নানা পরিসরে সে গল্পগুলো তাকে মুগ্ধ করেছে। স্বপ্ন দেখিয়েছে পায়ে হেঁটে হজ করার।

২০২২ সাল, শিহাবের জীবনের অন্যতম একটি বছর। এ বছরই আপন স্বপ্নকে স্পর্শ করার ইচ্ছে করেছেন তিনি। ২ জুনে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করলেন মক্কার উদ্দেশে। প্রয়োজন ছিলো সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসা সংগ্রহের। ভারতীয় মিশনের মাধ্যমে তার ব্যবস্থা করলেন। শুরু হলো তার লক্ষ্যের পানে এগিয়ে চলা। ভারতের সীমানা পেরিয়ে প্রবেশ করলেন পাকিস্তান। সেখান থেকে ইরান-ইরাক হয়ে কুয়েত। অবশেষে স্বপ্নের মক্কায়। এরই মধ্যে গত হয়েছে দীর্ঘ একটি বছর, আরো ১৭ দিন। পায়ে হেঁটেছেন আট হাজার ৬৪০ কিলোমিটার।

আরব নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে শিহাব বলেন, আমি যেদিন কুয়েত-সৌদি সীমান্তে পৌঁছি, তখন রমজান মাস। সময়টা ছিল ভোর ৫টা ১৭ মিনিট। সৌদি সীমান্তে প্রবেশ করেই আনন্দের আতিশয্যে হাঁটু বাঁকিয়ে বালি স্পর্শ করি। নিজের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে দেখে অবনত মস্তকে মহান রবের শোকর আদায় করি।

শিহাব প্রথম মদিনায় গমন করেন। সেখানে রওজায়ে আতহারে সালাম পেশ করেন। এরপর মক্কার উদ্দেশে রওনা হন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, রওজায়ে আতহার জিয়ারতের পর আমার মনে বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই আমাকে হজ করার তাওফিক দেবেন।

মক্কার পৌঁছার পর শিহাবের অনুভূতিই ভিন্ন। কালো গিলাফের দর্শনে মুহূর্তেই যেন সকল কষ্ট-ক্লেশ উবে গেল। নিজের অজান্তেই যেন দু’হাত উঠে গেল রাব্বুল কাবার সকাশে। আবেগের আতিশয্যে ঘণ্টাখানেক দোয়া করলেন। তিনি বলেন, এ সময় আমি মন খুলে দোয়া করেছি। পুরো মুসলিম উম্মাহের জন্য দোয়া করেছি।

যাত্রাপথে শিহাব নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। কখনো সহযোগিতা পেয়েছেন। কখনো অপরিচিত হিসেবেই মরু-বিয়াবান পাড়ি দিয়েছেন। এ সময়ের অভিজ্ঞতার জানান দিয়ে শিহাব বলেন, ভারত ও পাকিস্তানের লোকজন আমার এ সফরের কথা জানত। তাই তারা আমাকে বেশ সহযোগিতা করেছে। আগ্রহ নিয়ে দেখা-সাক্ষাতও করেছে। তবে ইরান-ইরাকে আমি তেমন সমর্থন পাইনি। সেখানে অপরিচিত হিসেবেই সফর করেছি। অবশ্য কুয়েত সীমান্তে যখন পৌঁছাই, যারা আমার এ সফর সম্পর্কে নানাভাবে জানতে পেরেছে, তারা যোগাযোগ করেছেন। দেখা-সাক্ষাত ও নানা সহযোগিতাও করেছেন।

তিনি আরো বলেন, যে দেশেই গেছি, স্থানীয় পুলিশ বা সামরিক বাহিনীর যারা আমাকে চিনতে পেরেছেন, সহযোগিতা করেছেন। কেউ তো নিজ বাড়িতে থাকার জন্য আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন।

এমন দুঃসাহসিক সফরকে সম্ভব করার প্রক্রিয়া জানাতে গিয়ে শিহাব বলেন, এ সফরের জন্য প্রস্তুত হতে আমার এক বছর সময় নিতে হয়েছে। এ সফরে নানা দেশ অতিক্রম হতে হবে, সেজন্য সেখানে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা দরকার ছিল। সেজন্য আমি নয়া দিল্লিতে কূটনৈতিক মিশনের মাধ্যমে বিষয়গুলোর সুরহা করে নিয়েছিলাম।

তিনি বলেন, সব দেশের জন্যই আমি ভিসা সংগ্রহ করেছিলাম। এক্ষেত্রে ইরান আমাকে এন্ট্রি ভিসা দিয়েছে। পাকিস্তান দিয়েছে ট্রানজিট ভিসা। কুয়েত পুলিশও আমাকে ছাড়পত্র দিয়েছে। আর সৌদি আরবের জন্য পেয়েছি মাল্টিপল-এন্ট্রি ভিসা। এখানকার কর্তৃপক্ষ আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছে। আমি হজ করার যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি। আমি সবার প্রতি খুব কৃতজ্ঞ।

নিজের সফরের আসবাবপত্র সম্পর্কে বলেন, এ সময় আমার কাছে ছিল একটি হাইকিং স্টিক, চারটি পোশাক দিয়ে সজ্জিত একটি ব্যাকপ্যাক, বন্য প্রাণী থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য মরিচের স্প্রে, অতিরিক্ত এক জোড়া জুতা, বাসনপত্র, অফিসিয়াল নথি ও হজের জন্য কিছু অর্থ।

তিনি বলেন, আমি হাঁটার জন্য ব্র্যান্ডেড জুতা ব্যবহার করেছি। পাকিস্তান যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমার ছয় জোড়া জুতা ব্যবহার করতে হয়েছে। কারণ, ভারতে বর্ষা ছিল। এতে জুতা নষ্ট হয়ে গেছে। পাকিস্তান থেকে মদীনায় পৌঁছা পর্যন্ত মাত্র এক জোড়া ব্যবহার করেছি।

তিনি আরো বলেন, এ সফরে আমার ব্যক্তিগত অর্থ খুব কম খরচ হয়েছে। কারণ, আমি যে দেশেই পৌঁছেনি, সেখানকার মুসলিম ভাইয়েরা আমার ব্যয়ভার বহন করেছেন। আমাকে কোনো খরচ করতে দেননি।

খাবারের বিষয়ে বলেন, আমি বিশেষ কোনো খাবার না, হালাল যেকোনো খাবার পেলেই খেয়ে নিতাম। এ সফরে বেশ আরামদায়ক ও মানসিকভাবে স্বস্তি ছিলাম।

পথঘাটের পরিস্থিতি তুলে ধরে শিহাব বলেন, মাঝেমধ্যে বিভিন্ন বনভূমি পাড়ি দিতে হয়েছিল। এ সময় বেশ ভয়ে ভয়ে পাড়ি দিতে হয়েছে। সেখানে বাঘ, ভাল্লুক ও এ জাতীয় আরো কিছু প্রাণীর ভয় ছিল। ইরানে তো একবার কিছু বন্য প্রাণীর পায়ের ছাপও দেখেছিলাম। আমার ফোনে তা ছবিবন্দিও করেছিলাম। পরে স্থানীয় লোকজনকে দেখালে তারা বললেন, এটা বাঘের পায়ের ছাপ। তখন মনে ভয়টা যেন জেঁকেই বসল।

তিনি আরো বলেন, ইরানের সফরটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতার। কারণ, আমাকে পুরো ইরান জুড়ে বরফের মধ্যে হাঁটতে হয়েছিল। আবহাওয়ার অবস্থা প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হচ্ছিল। এটিই ছিল আমার এ সফরের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

এতদূর সফর করা কিভাবে সম্ভব হয়েছিল, তার রহস্য বর্ণনা করতে গিয়ে শিহাব বলেন, মক্কা-মদিনায় পৌঁছা ছিল আমার বিশেষ লক্ষ্য। এ লক্ষ্যকেই সব সময় সামনে রেখেছিলাম। তাই এ কঠিন সফরকে আমার কাছে তেমন কঠিন মনে হয়নি।

তিনি বলেন, আমি অন্যদের জন্য নমুনা হতে চাই। আমার এ সফরে অনেকেই হজব্রত পালনে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। আমি সবাইকেই এ মহান ইবাদত পালনে অনুপ্রাণিত করতে চাই।

শিহাব বিভিন্ন সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় তার যাত্রার স্নিপেট শেয়ার করতেন। ইনস্টাগ্রামে তার ৪.৯ মিলিয়নেরও বেশি ফলোয়ার রয়েছে। ইউটিউবে আছে ১.৫ মিলিয়ন। তার একটি ফেসবুক পেজও রয়েছে।

সূত্র : আরব নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *