জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেছেন, যেসব অধ্যাদেশ বিএনপির কাছে মিষ্টি লেগেছে, মনে করেছে ক্ষমতায় থাকার পথ প্রশস্ত করবে সেগুলোকে তারা আইনে রুপান্তর করেছে।
রোববার (০৩ মে) রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত জাতীয় কনভেনশনে দেওয়া বক্তব্যে একথা বলেন তিনি৷
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী সেশনে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির সহ-প্রধান সারোয়ার তুষার।
হান্নান মাসউদ বলেন, সরকার স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ সংসদে পাস করেছে। এর ফলে কোনো ধরনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, তদন্ত ছাড়াই যে কোনো স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের অপসারণ করতে পারবে।
তিনি বলেন, বিরোধী দল থেকে কোন মেয়র, চেয়ারময়ান হলো– এখন সরকার যদি মনে করে তার দলের জন্য, রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর, তখন নির্বাচিত প্রতিনিধিকে সরিয়ে পছন্দের প্রশাসক বসাতে পারবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যেসব অধ্যাদেশ সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতো সেগুলোকে তারা বাতিল করে দিয়েছে।
আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনের পরেই আমি বলেছি, এটা প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার সংসদ। আমি কেন এলাম এই সংসদে এবং কী পেলাম? যে অধ্যাদেশগুলো আইন করলে সরকারের ক্ষমতা বাড়বে, সেগুলোকে তারা আইনে পরিণত করেছে। কিন্তু যেগুলো সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে, সেগুলো তারা ল্যাপস করে বাতিল করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সময়ে ভোট চুরি করে নির্বাচিত বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিনিধিদের সরাতে একটি বিশেষ মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল, নির্বাচিত সরকার এসে সেটিকে আইনে পরিণত করেছে। যার মাধ্যমে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই তারা স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের অপসারণ করতে পারবে। ফলে বিরোধী দলের কাউকে তাদের অপছন্দ হলে তাকে সরিয়ে পছন্দমতো প্রশাসক বসাতে পারবে।
তিনি বলেন, আমাদের কিছু দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও বিএনপির প্রস্তাবনা অনুযায়ী পুলিশ কমিশন হয়েছে। কিন্তু সরকারে গিয়ে এটি বিএনপির পছন্দ হচ্ছে না। তারা গুম কমিশন বাতিল করেছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিএনপিই চাচ্ছিল। কিন্তু সরকারে গিয়ে তা বাতিল করল। সংবিধান সংস্কারের যে কথা এসেছে, সেখান থেকেও বিএনপি সরে গেছে। আমরাও তাহলে নতুন সংবিধানের দাবিতে ফিরে যাব।
সমাজবিজ্ঞানী মির্জা হাসান বলেন, জুলাই সনদে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য বিষয়। যার মূল কথা হলো রাষ্ট্রের যে প্রধান তিনটি অঙ্গ রয়েছে তথা বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ঠিক রাখা।
তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার কমিটির প্রথমদিকে যে কথা বলেছে, তার অনেককিছু র্যাডিক্যাল ছিল। বিশেষ একই ব্যক্তি সরকার প্রধান এবং দলের প্রধান হতে পারবে না। সেখানে বিএনপি চাপ তৈরি করার কারণে কম্প্রমাইজ করা হয়েছে। এরপরও যেটি রক্ষা হয়েছে, সেটিও অনেক বড় অর্জন ছিল। সেটাও যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারতাম!
তিনি আরও বলেন, সুশীল সমাজ বলেছে, এই সনদের সাথে মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু এটি ভ্রান্ত ধারণা। কারণ, ঐকমত্য কমিশনে আসার জনগণের মতামত নেওয়া হয়েছে, জরিপ করা হয়েছে। সমালোচনা রয়েছে যে, মানুষ গণভোটে না বুঝে ভোট দিয়েছে। কিন্তু দেখবেন, ব্রেক্সিট যখন হলো, তখন একটি জটিল রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল। ১৯৯১ সালের গণভোটে সংবিধান থেকে একটি লাইন তুলে দেওয়া হয়েছে; যেটার জন্য সংবিধান সম্পর্কে জানতে হবে। ফলে মানুষ নিজেদের মতো করে বুঝতে পারে। তাদেরকে সম্মান করতে হবে। তাদের মতো করে তারা বোঝে।
সরোয়ার তুষার বলেন, বিএনপি সরকার সংস্কার করতে চায় না। অনেকে এতদিন তাদের একটি ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রথম অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর এটা পরিষ্কার যে, বিএনপি সরকার আর সংস্কার করবে না। শুধু তাই নয়, দলীয় ও নির্বাচনী ইশতেহারে যে সংস্কারের কথা তারা বলেছে, সেখানে ফেরাও বিএনপির পক্ষে সম্ভব না। তারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের মাধ্যমে তারা তা ভঙ্গ করেছে।
তিনি বলেন, একটা যুক্তি অনেকে দেন যে, আমাদের সরকার, তাই আমরা সব জায়গায় আমাদের লোক বসাব। কিন্তু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে আপনি দলীয় লোক বসাতে পারেন না। সব জায়গায় বিএনপির দলীয় লোক বসালেও রাষ্ট্রপতি বানানোর মতো একটি লোক বিএনপিতে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত এবং ইতোমধ্যে তিনি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন বলে বিএনপির লোকেরাই বলছেন। সংস্কার বাস্তবায়ন করা আমাদের দায়িত্ব এবং বিএনপি সংস্কার বাস্তবায়ন না করলে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।