আটঘাট বেঁধে মাঠে নামছে বিএনপি!

নতুন কর্মসূচির কথা ভাবছে বিএনপি। হরতাল-অবরোধের সঙ্গে নতুন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার পরিকল্পনা দলটির। এবার আর আলাদা আলাদা নয়, এক ব্যানারেই কর্মসূচি পালন করবে বিরোধী শিবির। দাবি আদায়ে রাজপথেই ফয়সালা করতে চায় দলটি। একই সঙ্গে আন্দোলনে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়াতে নানামুখী কৌশলও নেয়া হচ্ছে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীর ওপর অত্যাচার-নির্যাতন, গ্রেপ্তার, হয়রানি এবং দ্রব্যমূল্যের ইস্যুকে সামনে রেখে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা এঁটেছে বিএনপির হাইকমান্ড।

সূত্র জানায়, মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের শেষ দিন আগামী ৪ ডিসেম্বর। এদিকে ৩ ও ৪ ডিসেম্বর ফের ৪৮ ঘণ্টা অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। এরপরও চলমান কর্মসূচি হরতাল-অবরোধ অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি নতুন কর্মসূচি নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। সরকার বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের নতুন কর্মসূচির ভাবনায় রয়েছে— বিক্ষোভ, সমাবেশ, ঘেরাও, গণমিছিল, পদযাত্রা এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে জমায়েত কিংবা নির্বাচন কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ ভবন ঘেরাও। এমনকি সরকার বিরোধী সব রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো একই ব্যানারে কর্মসূচি পালনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমাদের কর্মসূচি চলমান রয়েছে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে আন্দোলন কর্মসূচি পরিবর্তন হয়। সামনে কর্মসূচি নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে, জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতি রেখে নতুন ধরনের কর্মসূচির কথা ভাবা হচ্ছে। এ নিয়ে দলের নীতিনির্ধারকরা আলোচনা করে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। সেটা সময় হলেই জানতে পারবেন।

২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশে সংঘর্ষ ও হতাহতের পর অনেকটাই এলোমেলো হয়ে পড়ে বিএনপি। সারা দেশে গ্রেপ্তার হন কয়েক হাজার নেতা। এরপর থেকে দলটির নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে থেকে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি পরিচালনা করছিলেন। এক মাস পর দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও বেগম সেলিমা রহমান প্রকাশ্যে এসেছেন। ফিরে গেছেন কোনো ধরনের পুলিশি হয়রানি ছাড়াই।

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৮ অক্টোবরের পর থেকে একদিকে গ্রেপ্তার আতঙ্ক অপরদিকে বিএনপি নেতাদের যাতে নির্বাচনে ভাগিয়ে নিতে না পারে। এ জন্যই মূলত আত্মগোপনে চলে যায় দলের নেতাকর্মীরা। তফসিল অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন। আর এর মধ্য দিয়ে কার্যত বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দলের নির্বাচনে অংশ না নেয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত হয়ে গেল। যেহেতু নির্বাচনে অংশ নেয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই— তাই এখন থেকে আস্তে আস্তে মাঠে নামতে শুরু করবে। বিএনপির হাইকমান্ড বিভিন্ন ইউনিটের নেতাদের মাঠে নামার নির্দেশনা দিয়েছে। নির্বাচন ঠেকাতে মাঠের আন্দোলনের কোনো বিকল্প দেখছেন না তারা।

জানা গেছে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারবিরোধী দলগুলোর সিদ্ধান্ত ছিল- দুই পর্বে ভাগ করে আন্দোলনের কর্মসূচি প্রণয়ন করা হবে। এ কর্মসূচির প্রথম পর্বের সময়কাল ধরা হয়েছিল প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ৩০ নভেম্বর। অবশ্য এ পর্বটিকে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের শেষ দিন আগামী ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আগামীকাল রোববার ও সোমবার ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি। এরপর শুরু হবে দ্বিতীয় পর্ব। এ পর্ব চলবে ৭ জানুয়ারি ভোটের দিন পর্যন্ত। দুই পর্বে পরিস্থিতি বুঝে কর্মসূচি দেয়া হবে।

যুগপৎ আন্দোলনে থাকা নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দ্বিতীয় পর্বে কী ধরনের কর্মসূচি আনতে চায় তা নিয়ে এখনো বিএনপি ও তার শরিক দলগুলো আলোচনা করছে। এক্ষেত্রে হরতাল-অবরোধের পাশাপাশি বিক্ষোভ, সমাবেশ, ঘেরাও, গণমিছিল, পদযাত্রা ইত্যাদি কর্মসূচি আলোচনায় রয়েছে। আগামী তিন সপ্তাহ চলতে পারে এমন কর্মসূচি। এ সময়ের মধ্যে রাজধানীতে নারী সমাবেশ, যুব সমাবেশ, শ্রমিক সমাবেশ ও ছাত্র সমাবেশ করার কথাও ভাবছেন আন্দোলনকারীরা। জনগণ যাতে নির্বাচনমুখী না হয়, সে জন্য প্রচার কার্যক্রমও অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এছাড়া কারাবন্দি, গুম-খুন ও নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীর স্বজনদের নিয়ে সারা দেশের জেলা শহরেও পর্যায়ক্রমে মানববন্ধন আয়োজনের চিন্তাও রয়েছে বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলোর। এসব মানববন্ধন থেকে জেলা ও দায়রা জজ বরাবর স্মারকলিপি দেয়া হবে।

দলটির একাধিক সূত্র বলছে, বিএনপির হাইকমান্ড বিভিন্ন ইউনিটের নেতাদের মাঠে নামার নির্দেশনা দিয়েছে। নির্বাচন ঠেকাতে মাঠের আন্দোলনের কোনো বিকল্প দেখছেন না তারা। অনেকেই বলছেন নির্বাচনের দিন অর্থাৎ, ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত কর্মসূচি চলমান থাকবে। হরতাল-অবরোধ চলমান থাকবে পাশাপাশি বিক্ষোভ ও ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি আলোচনায় রয়েছে।

চলমান অন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে সরকার বিরোধী ৩৯টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর তোপখানায় শিশুকল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে যৌথসভা করেছে বিএনপি। সেই সভা থেকে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল বাতিলের দাবি জানিয়েছে দলগুলো। সভায় নেতারা বলেন, ‘আমরা রাজপথে সক্রিয় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করে আসছি। এ জন্য আমরা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, জাতীয় সংসদের বিলুপ্তি, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ হয়রানিমূলক রাজনৈতিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ও গ্রেপ্তার রাজবন্দিদের মুক্তি এবং বিদ্যমান অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সরকার ব্যবস্থা ও সংবিধান সংস্কারের দাবিতে যুগপৎ ধারায় এক আন্দোলনে আছি। এ দাবিগুলো ইতোমধ্যে গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।’ বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, এক মাস পরে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করল বিএনপি। বৈঠকে চলমান হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি নিয়ে পর্যালোচনা হয়। চলমান হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আগামী দিনে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে হরতাল-অবরোধের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচির বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হয়। কর্মসূচির ভিন্নতার বিষয়ে বেশি মতমত আসে। এদিকে সরকারবিরোধী ইসলামি দল ও জোটগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে তাদের মতামত নিয়ে নতুন কর্মসূচির সিদ্ধান্ত জানাবে বিএনপি।

বৈঠকের একটি সূত্র জানায়, পুলিশের কাছে অনুমতি চেয়ে ঢাকায় বিক্ষোভ সমাবেশের প্রস্তাব দিয়েছেন কয়েকজন নেতা। কোনো কোনো নেতা পুলিশের অনুমতি ছাড়াই নির্বাচন কমিশন ঘেরাওয়ের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন পেশাজীবী, নারী সংগঠনসহ গুম-খুন ও কারা নির্যাতিত পরিবারের সদস্যদের মাঠে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা সমমনা ও নির্বাচনের বাইরে থাকা বাম-ডান ও ইসলামি দলগুলো নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের পরিকল্পনা করছে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল।

জানা গেছে, কেন্দ্র থেকে গ্রেপ্তার এড়াতে তৃণমূল পর্যন্ত নির্দেশনা দিয়েছে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। সেই নির্দেশনা মেনেই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। এ জন্য নেতকার্মীরা নিজ বাড়িঘর বা আত্মীয় বাড়িতেও রাতযাপন থেকে বিরত রয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা গাছের ডালে, ফসলি জমিতে এমনকি গোয়ালঘরে রাতযাপন করছেন। সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে তারা অনেকটাই টালমাটাল। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য চলমান হরতাল-অবরোধ অব্যাহত রেখে কর্মসূচিতে ভিন্নতা আনতে আলোচনায় রয়েছে। যেখানে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকবে, এমন কর্মসূচি নিয়েই এগোতে চায় দলটি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেন, আমরা আন্দোলনে রয়েছি। সামনে কী কর্মসূচি আসবে তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সময় হলেই কর্মসূচির বিষয়ে জানতে পারবেন। গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ৩৯টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে বিএনপির। আগামী দিনে কর্মসূচি নিয়ে বিভিন্ন মতামত এসেছে। সামনের দিনে কর্মসূচির ধরন বদলাতে পারে। সভা-সমাবেশের পাশাপাশি ঘেরাও কর্মসূচি আসবে। ইতোমধ্যে কারাবন্দি নেতাদের স্বজনদের দিয়ে একটি সমাবেশ হয়েছে, যা বিভাগীয় পর্যায়ে করার চিন্তা আছে।

১২ দলীয় জোটের জোটের নতুন মুখপাত্র শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, বৃহস্পতিবার যুগপৎ আন্দোলনে থাকা ৩৯টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিএনপি। বৈঠকে এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে যাতে না যায় সেই ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে বলা হয়েছে। আগামী দিনে কোন ধরনের কর্মসূচি দেয়া যায়— তা নিয়ে মতামত দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ নেতা কর্মসূচির পরিবর্তনের বিষয়ে মত দিয়েছেন। অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে কর্মসূচিতে পরিবর্তন আসবে। প্রসঙ্গত, গত ২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশে হামলা, নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ এবং সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে পরদিন ২৯ অক্টোবর এবং ৩১ অক্টোবর, ১ ও ২ নভেম্বর মোট তিন দিনের অবরোধ কর্মসূচি পালন করে বিএনপি-জামায়াত ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা। পরবর্তীতে ৫ ও ৬ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় এবং ৮ ও ৯ নভেম্বর তৃতীয় দফায় অবরোধ কর্মসূচি পালন করে সরকারবিরোধী দলগুলো। পরে ১১ ও ১২ নভেম্বর চতুর্থ দফা এবং ১৫ ও ১৭ নভেম্বর পঞ্চম দফায় ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেয় তারা। এরপর জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তা প্রত্যাখ্যান করে ফের ১৯ ও ২০ নভেম্বর সারা দেশে হরতাল পালন করে সরকারবিরোধী দলগুলো। পরবর্তীতে ২২ নভেম্বর ভোর ৬টা থেকে ষষ্ঠ দফায় ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ পালন করে দলটি। গত ২৪ নভেম্বর ভোর ৬টায় শেষ হয় ওই অবরোধ কর্মসূচি। এরপর আবারও একদিন বিরতি দিয়ে সপ্তম দফায় ২৬ নভেম্বর ভোর ৬টা থেকে ২৮ নভেম্বর ভোর ৬টা পর্যন্ত সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি দেয় বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। এর পরে অষ্টম দফায় দেশজুড়ে বুধবার ২৯ নভেম্বর ভোর ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার অবরোধ এবং বৃহস্পতিবার ৩০ নভেম্বর সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচি পালন করে বিএনপি-জামায়াত ও সমমনা দলগুলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *