গাজা দখল বা শাসন করার চিন্তা করছে না ইসরায়েল–নেতানিয়াহু

হামাসের সাথে যুদ্ধ সমাপ্তির পর ইসরায়েলের গাজা জয়, দখল বা শাসন করার কোন লক্ষ্য নেই বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কোন সশস্ত্র বাহিনীর হুমকি ঠেকাতে একটা ‘যথাযোগ্য শক্তির’ সেখানে প্রবেশের দরকার হতে পারে।

“আমরা গাজা জয় করতে চাই না, আমরা গাজা দখল করতে চাই না এবং আমরা গাজা শাসন করতে চাই না”, মি. নেতানিয়াহু যোগ করেন। বলেন, সেখানে একটা বেসামরিক সরকারের প্রয়োজন হবে, কিন্তু একই সাথে ইসরায়েলকে এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে ৭ই অক্টোবরের মতো হামলা, যেখানে হামাস তাদের ১৪০০ জন নাগরিককে হত্যা করেছে, সেরকম আর ঘটবে না।

“দরকার হলে একটা যথাযোগ্য বাহিনী গাজায় প্রবেশ করবে এবং হত্যাকারীদের হত্যা করবে। কারণ সেটাই হামাসের মতো আরেকটা সংস্থার গড়ে ওঠা ঠেকাবে”, বলেন তিনি।

এর আগে নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন গাজায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে ইসরায়েল, যার সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

গাজায় প্রতিদিন চার ঘণ্টার সামরিক বিরতি

ইসরায়েল উত্তর গাজায় প্রতিদিন চার ঘণ্টার সামরিক বিরতি শুরু করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র জন কিরবি।

তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলেন, এটা খুবই ‘স্থানীয় এবং সামান্য একটা পদক্ষেপ’ যা তাদের ‘যুদ্ধ থেকে মনোযোগ সরাবে না’।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন এই সময়টায় দুটি ‘জরুরি মানবিক পথ’ দিয়ে মানুষজন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে যেতে পারবে। উত্তর গাজা থেকে বেসামরিক লোকদের বের হবার সুযোগ করে দিতে ইসরায়েলের প্রতিদিন বোমা হামলায় এই চার ঘণ্টার বিরতির বিষয়ে সম্মত হওয়া তাদের সঠিক সিদ্ধান্তের পথে একটি ধাপ।
ইসরায়েল এমন সময় এই সিদ্ধান্ত নিলো যখন প্রায় ১০ দিন পর ইসরায়েলি বন্দিদের এক ঝলক দেখলো বিশ্ব, গাজার দ্বিতীয় বৃহৎ সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক জিহাদ দুই বন্দির একটা ভিডিও প্রকাশ করেছে।

বন্দিদের একজন ৭০ বছর বয়সী হানা কাতসির, যাকে একটা হুইলচেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায়। ৭ই অক্টোবর সীমান্তবর্তী শহর নির ওজ থেকে তাকে ধরে নিয়ে আসা হয় গাজায়। আরেকজন হলো অল্পবয়সী এক কিশোর।

গাজায় ২৪০ জন বন্দির ভাগ্য নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে তীব্র আলোচনা চলছে দুই পক্ষের। তবে তাদের ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে কোন চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়টি আপাতত আলোচনার বাইরে বলেই মনে করছেন বিবিসির পল অ্যাডামস।

ইসরায়েলের সেনাবাহিনী যখন গাজা শহরের কেন্দ্রস্থলে তীব্র লড়াইয়ে লিপ্ত ঠিক সেই সময় ইসরায়েলি বন্দিদের ভিডিওটি প্রকাশ পেল। গাজার দুটি প্রধান হাসপাতাল – আল শিফা ও আল কুদসের পাশেই হামাসের সাথে লড়াই চলছে ইসরায়েলি বাহিনীর।

বৃহস্পতিবার ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ) জানায় তারা আল শিফা হাসপাতালের পাশে হামাসের ‘সামরিক দপ্তরে’ অভিযান চালিয়ে অন্তত ৫০ জন ‘সন্ত্রাসীকে’ হত্যা করেছে।

এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান তিনি আল কুদস হাসপাতালের দিকেও ট্যাঙ্ক থেকে গুলি ছুড়তে দেখেছেন।

প্রায় দুই হাজার রোগী ও ৫০ হাজার উচ্ছেদ হওয়া মানুষ এখন আল শিফা হাসপাতালের ভেতরে আছে বলে জানা যাচ্ছে। এটি গাজা শহরের উত্তর রিমালের পাশে অবস্থিত সেখানকার সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

অন্যদিকে পশ্চিম তীরেও সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। জেনিনের শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি অভিযানে ১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে বলে জানায় সেখানকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এর আগে বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি বাহিনী কয়েক ঘণ্টার জন্য আবারও গাজার প্রধান সড়কটি খুলে দেয় যাতে বেসামরিক নাগরিকরা দক্ষিণে সরে যেতে পারে। হাজার হাজার লোক এসময় পায়ে হেঁটেই রওয়ানা দেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে ইসরায়েলের সাথে তারা আলোচনা চালিয়ে যাবে সামরিক বিরতির সময় ও স্থায়িত্ব নিয়ে।

মি. বাইডেন জানান একইসাথে গাজায় সাহায্য ও সহায়তা কীভাবে আরও বাড়ানো যায় সে চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, তারা প্রতিদিন অন্তত ১৫০টি ত্রাণবাহী ট্রাক সেখানে প্রবেশ করানোর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছেন।

কিন্তু জাতিসংঘ বলছে এখন যে পরিমাণ সাহায্য গাজায় ঢুকছে তা সেখানকার ‘অসহনীয়’ মানবিক পরিস্থিতি ও মানুষের চাহিদার তুলনায় ‘খুবই সামান্য’। প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে আবারও গাজায় যুদ্ধবিরতির আহবান জানানো হয়।

৯৯ জন কর্মচারী নিহত : দাবি জাতিসংঘের

জাতিসংঘ বলছে তাদের ৯৯ জন সহকারী মারা গিয়েছে

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) যোগাযোগ বিষয়ক পরিচালক জুলিয়েট টোওমার সাথে কথা হয় বিবিসির। তিনি বলেন, গাজার পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে।

ইউএনআরডব্লিউএ এই মুহূর্তে তাদের ১৫০টি আবাস থেকে ৭ লাখের বেশি লোককে সাহায্য করছে বলে জানান মিজ টোওমা। বিবিসি নিউজ চ্যানেলকে তিনি বলেন, তার কলিগের মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে, যা এই মুহূর্তে ৯৯ জনে এসে দাঁড়িয়েছে।

“আমাদের সাপ্লাই আসছে না এবং জ্বালানি সংকট রয়েই গিয়েছে,” তিনি যোগ করেন, জাতিসংঘের কোন কর্মকর্তাকে পেলেই বাচ্চারা একটু রুটি বা পানি চাইছে তাদের কাছে।

তিনি জানান তাদের কাজ চালিয়ে যেতে এই মুহূর্তে দুটি জিনিস প্রয়োজন: জ্বালানি ও মানবিক যুদ্ধবিরতি।

গত ৭ই অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে গাজায় আর কোন জ্বালানি ঢুকতে দেয়নি ইসরায়েলি বাহিনী। তবে সেখানে কোন মানবিক বিপর্যয় ঘটছে বলে জাতিসংঘের অভিযোগ অস্বীকার করছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র জন কিরবি জানান তারা ইসরায়েলের উপর চাপ অব্যাহত রাখবে যেন তারা মানবিক সাহায্যের মধ্যে জ্বালানিকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং মিশরের রাফাহ সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের অনুমতি দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *