আনিস ও হারিসের পলাতক অবস্থায় সাজা মওকুফ বেআইনি

বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের দুই ভাই আনিস আহমেদ ও হারিস আহমেদের সাজা তারা পলাতক থাকা অবস্থায় মওকুফ করা হয়েছে৷ বিষয়টিকে বেআইনি বলেছেন বাংলাদেশের আইন ও সংবিধান বিশ্লেষকরা৷
তারা বলছেন, এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত৷ তবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, ‘‘পলাতক অবস্থায় সাজা মওকুফ করা যাবে কিনা আইনে তা স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই৷’’

গত ১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত আল জাজিরার প্রতিবেদনে আনিস আহমেদ ও হারিস আহমেদকে ‘পলাতক’ বলা হলেও বাস্তবে ঘটনার সময় তারা পলাতক ছিলেন না৷ তার আগেই তাদের সাজা মওকুফ করা হয়৷ আল জাজিরার প্রতিবেদনে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে সেনা প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের সঙ্গে তার ‘পলাতক দুই ভাই আনিস ও হারিসের যে ছবি দেখানো হয়েছে, সেই প্রসঙ্গে মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমকে সেনাপ্রধান বলেন, ‘‘সেদিন আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে না কোনো সাজা ছিল, না তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল৷’’

একদিন আগে আইএসপিআর-এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘‘গত ২৯ মার্চ ২০১৯ তারিখে সেনাবাহিনী প্রধানের ছেলের বিবাহোত্তর সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান হয়, যেখানে বিশিষ্ট গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন৷ অথচ তার পূর্বেই সেনাবাহিনী প্রধানের ভাইয়েরা (আনিস এবং হাসান) তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ষড়যন্ত্রমূলক, পরিকল্পিতভাবে দায়েরকৃত সাজানো ও বানোয়াট মামলা হতে যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অব্যাহতি পান৷ ফলে ২৯ মার্চ ২০১৯ তারিখে সেনাবাহিনী প্রধানের ছেলের বিবাহোত্তর অনুষ্ঠানে তার কোনো ভাই কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত বা পলাতক আসামি অবস্থায় ছিলেন না, বরং সম্পূর্ণ অব্যাহতিপ্রাপ্ত হিসেবেই তারা ঐ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন এবং উক্ত সময়ে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা অনিষ্পন্ন অবস্থায় বা চলমানও ছিল না৷’’

তবে এই দুই জনের সাজা মওকুফ করা হলেও তা ছিল অনেকটাই গোপন৷ বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটেও মঙ্গলবার পর্যন্ত হারিস আহমেদের নাম ও ছবি মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনালের তালিকায় দেখা গেছে৷ তাদের দুই ভাইয়ের পলাতক অবস্থায় সাজা মওকুফের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র এবং আইনমন্ত্রীও স্পষ্ট করে সংবাদমাধ্যমকে কিছু বলতে পারেননি৷ এমনকি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীও পরিষ্কার কিছু বলতে পারেননি৷

আর তারা যে পলাতক অবস্থায় সাজা মওকুফ পেয়েছেন তার বড় প্রমাণ হলো মওকুফের পর তাদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট প্রত্যাহার করতে বলা৷

যেভাবে সাজা মওকুফ:
১৯৯৬ সালের ৭ মে ঢাকার মোহাম্মদপুরে ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান হত্যায় তিন ভাই আনিস আহমেদ, হারিস আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফসহ ছয় জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দেয়া হয়৷ বিচারে জোসেফ এবং মাসুদের মৃত্যুদণ্ড এবং হারিস ও আনিসসহ তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়৷ জোসেফ কারাগারে আটক থাকায় আপিল করেন৷ হাইকোর্টের আপিলে তার মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও আপিল বিভাগে সাজা কমে যাবজ্জীবন হয়৷ হারিস ও আনিস পলাতক থাকায় তারা আপিলের সুযোগ পাননি৷

জোসেফকে ২০১৮ সালে রাষ্ট্রপতি সাজা মওকুফ করে দিলে তিনি কারাগার থেকে ছাড়া পান৷ আর আনিস ও হারিস পলাতক থাকার পরও ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ সরকার তাদের সাজা মওকুফ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে৷ ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ এবং সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদটি সাজা মওকুফ ও স্থগিত সংক্রান্ত৷ তবে মৃত্যুদণ্ড মওকুফের বিষয়টি এককভাবে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার৷ আর এর বিধানটি সুনির্দিষ্ট, কারণ ও অপরাধ স্বীকার করে এর সুযোগ পাওয়া যায়৷ তাছাড়া এতে সংশ্লিষ্ট বিচারকেরও মতামত প্রয়োজন হয়৷

আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘‘ফৌজদারি কার্যবিধিতে পলাতক বা পলাতক না এরকম কিছু বলা না থাকলেও আটক বা আত্মসমর্পণ ছাড়া এই সুবিধা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই৷ আত্মসমর্পণ না করে কেউ জামিন বা আপিলেরও সুযোগ পান না৷ পলাতক আসামি আইনের কোনো সুবিধা পায় না৷ বাংলাদেশে এই দুইজন বাদে এখন পর্যন্ত কোনো পলাতক আসামি সাজা মওকুফ পাননি৷ আইনে নেই বলেই সুযোগ পায়নি৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *